বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে জোরপূর্বক নিরুদ্দেশকরণ তথা গুমের ঘটনা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে ২০১২ সালেই এ পর্যন্ত প্রায় ২২ জন গুম হয়েছেন। আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর হিসাবমতে ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫০।
গুম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ বাংলা একাডেমীর বাংলা-ইংরেজি অভিধানে লেখা আছে-Carried off, concealed, kidnapped, carried away and confined unlawfully and with a motive। ইংরেজি যে প্রতিশব্দ দেওয়া হয়েছে সে প্রতিশব্দের সাথে ব্যবহারিক শব্দের বেশ ফারাক। গুমের একটি ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে কিডন্যাপ বা অপহরণ। কিন্তু, কিডন্যাপিং বাংলাদেশের আইনে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের একটি কনভেনশন আছে-International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance-বাংলা করলে যার মানে দাঁড়াবে-জোরপূর্বক মানব-গুমের বিরুদ্ধে সুরক্ষা কনভেনশন। এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদানকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম নেই।
মানব-গুমের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে কনভেনশনে এভাবে, ”রাষ্ট্র অথবা রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত এজেন্ট, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে/সম্মতিক্রমে সংগঠিত গ্রেপ্তার, আটকাদেশ, অপহরণ বা অন্য কোনো ধরনের অধিকারহরণ যার মধ্যে আটকাবস্থার কথা অস্বীকার, সর্বশেষ অবস্থান বা ভাগ্য সম্পর্কে জানতে না দেওয়া, যার মাধ্যমে আইনের আশ্রয়লাভ থেকে বঞ্চিত করা হয়।”
ইংরেজি abduction শব্দের বাংলা অপবাহন। কারণ, অপহরণ (kidnapping) এবং অপবাহনের (abduction) মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অপবাহনের সংজ্ঞা দণ্ডবিধিতে দেওয়া হয়েছে এভাবে-”যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে কোন স্থান হতে গমন করার জন্য জোরপূর্বক বাধ্য করে বা কোন প্রতারণামূলক উপায়ে প্রলুদ্ধ করে, সে ব্যক্তি উক্ত ব্যক্তিকে অপবাহন (abduction) করে বলে গণ্য হবে। অপহরণের ক্ষেত্রে যেখানে হরণকৃত নাবালক অথবা অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তিকে শুধুমাত্র হরণকারীর সাথে নিয়ে যাওয়া হয় অথবা যেতে প্ররোচিত করা হয়। কিন্তুু অপবাহনের ক্ষেত্রে প্রতারণা, ভয় এবং বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
যেহেতু জোরপূর্বক মানব-গুমের বিরুদ্ধে সুরক্ষা কনভেনশনে বাংলাদেশ এখনও স্বাক্ষর করেনি, সেহেতু বাংলাদেশের উপর এই কনভেনশন মানার বাধ্যবাধকতা নেই। কনভেনশনের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
মানব-গুমের এই প্রবণতা বজায় থাকলে বাংলাদেশের জন্য এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করা জরুরি হয়ে দাঁড়াবে।জোরপূর্বক মানব-গুম একটি জঘন্য অপরাধ যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে।
জোরপূর্বক মানব-গুমের বিরুদ্ধে সুরক্ষা কনভেনশনের ৫ নং অনুচ্ছেদে গুমকে আন্তর্জাতিক আইনে বিচারযোগ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ কখনও এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করলে গুমের সাথে জড়িতদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন