শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

আমি কারে ধরে কাঁদবো রে মা!

এই মূহুর্তের খবর ও জন দূর্ভোগ ।: না বলা কথা



শরিয়তপুর সখীপুর আরশীনগর থেকে: আরশীনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরদার কাঁদছেন অথচ চোখ থেকে জল পড়ছে না। কান্নার রং কি তা ভুলে গেছে তিনি। চোখের পাতা ফোলা। যেনো রক্ত জমাট বেঁধেছে তার দু`চোখে। বারবার ম‍ূর্ছা যাচ্ছেন। টানা দু’দিন অবিরাম কেঁদে চোখের সব জল যেনো শুকিয়ে গেছে আরশিনগরের চেয়ারম্যানের! তবে জল শুকিয়ে গেলেও তার চিহ্ন রয়ে গেছে জাকির চেয়ারম্যানের চোখে মুখে।

শুক্রবার সরেজমিন বাংলানিউজের ফটো সাংবাদিক নাজমুল হাসান ও বাংলানিউজের শরিয়তপুর জেলা প্রতিনিধি শহিদুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে সখীপুর থানার আরশীনগর গ্রামে পা রাখতেই দেখা গেছে শোকের মাতম।

চেয়ারম্যানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের ১১ জনকে হারিয়ে যেনো বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন চেয়ারম্যান জাকির সরদার। যাকে দেখছেন, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন। কখনো জোরে চিৎকার দিয়ে বুক চাপড়াচ্ছেন। আর আহাজারি করে বলছেন, ‘১১ লাশের শোক আমি কীভাবে সইবো রে আল্লাহ!’

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত একমাত্র আদরের মেয়ে লুমাইসা লুবারের (১৩) উদ্দেশ্যে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘কবর থেকে উঠে আয় রে মা! মারে আমি তোরে ধইরা একটু কাঁদতে চাই। আমার বুকের মানিক আমার বুকে আয়... বুকে আয় লুবাব...। আমারে শক্ত কইরা ধইরা আমার বুকে মাথাটা রাখ। আমি আর সইতে পারছি নারে মা! আমি কারে ধরে কাঁদবো রে মা!’

ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শুক্রবার সকালে আরশিনগরের চেয়ারম্যান বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সমবেদনা জানাতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী আর আশপাশের গ্রামের মানুষ। সেখানে জাকির সরদারের দিকে তাকিয়ে চোখের জল মোছেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ স্থানীয় জনসাধারণ জাকির চেয়ারম্যানকে দেখতে আসছেন। তবে কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার সাহস করছেন না।

কীভাবে সান্ত্বনা দেবেন আরশিনগরের সবার প্রিয় মানুষ ও জনগণের সেবক হিসেবে পরিচিত জাকির চেয়ারম্যানকে। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও যেনো সবাই হারিয়ে ফেলেছেন।

বাংলানিউজের প্রতিবেদকের হাত ধরে চিৎকার দিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভাই রে আমি আর শোক সইতে পারছি না। আমার নিজে শেষ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

এ সময় জাকির চেয়ারম্যান ওপরে দু’হাত তুলে বলেন, ‘আল্লাহ আমি আত্মহত্যা না করলে আমি আর বাঁচতে পারবো না। আমারে তুমি ক্ষমা করে দিও। আমার এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কি নিয়ে বাঁচবো আমি...।’

এ সময় উপস্থিত অনেকেই চোখের জল মোছেন।

তিনি সরকারের প্রতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আর কত লাশ হলে সরকারের কানে যাবে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে।’

বুক চাপড়ে বলেন, ‘এত দাবি, এত মানববন্ধন এত লেখালেখি তারপরও কি সরকারের কানে এসব যায় না।’

ভেদরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আবদুল মান্নান হাওলাদার বাংলানিউজকে বলেন, ‘পরিবারের সবাইকে যে হারিয়েছে, তাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবো? স্ত্রী, মেয়ে, বোন, ভগ্নিপতি, ভাগ্নে ও ভাগ্নি সব হারানো একটা মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার তো কোনো ভাষা থাকে না।’

জাকির হোসেন সর্দারের ভাই অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শরিয়তপুরের ইতিহাসে সড়ক দুর্ঘটনায় এক পরিবারের ১১ জন মারা যায়নি।’

উল্লেখ্য, রাজধানীর অদূরে বুধবার কেরানীগঞ্জের কদমপুর এলাকায় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী। তাদের মধ্যে দশজন শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর থানার আরশিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির সর্দারের পরিবারের সদস্য। বাকি দুজন গৃহকর্মী ও গাড়িচালক। নিহতরা হলেন: ইউপি চেয়ারম্যান জাকির সর্দারের স্ত্রী বেবী সর্দার (৪৪), মেয়ে নবম শ্রেণীর ছাত্রী লুমাইসা লুবার (১৩), জাকিরের বড় বোন ফেরদৌসী বেগম (৪৭) ও তার ছেলে সায়েম হাসান (১৫), জাকিরের ছোট বোন রোজিন (৩৩) ও তার স্বামী সাউথইস্ট ব্যাংক মতিঝিল শাখার কর্মকর্তা রেজাউল আমিন (৩৮), তাদের ছেলে ইয়াশ (৮) ও মেয়ে ইশরা (২), জাকিরের মেজো বোন ফাতেমার মেয়ে তাজরিয়া (১২), গৃহকর্মী কোহিনূর (১৫) ও খুশি (১৪) এবং গাড়িচালক সোহেল রানা (৩৫)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন